আজ : রবিবার, ২৩শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নদীবন্দর, নদীভাংগন, টেকসই কৃষি ও খাদ্যে উদ্বৃত্ত উপজেলা গোয়ালন্দ


প্রতিবেদক
জনতার মেইল.ডটকম

প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ণ ,৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | আপডেট: ৪:২৮ অপরাহ্ণ ,৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০
নদীবন্দর, নদীভাংগন, টেকসই কৃষি ও খাদ্যে উদ্বৃত্ত উপজেলা গোয়ালন্দ

উপজেলা কৃষি অফিস, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী।। পদ্মা নদী বেষ্টিত এবং নদী ভাংগন কবলিত ছোট্র এবং ঐতিহাসিকভাবে সুপরিচিত একটি উপজেলার নাম হচ্ছে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দের স্টিমার ঘাট, রেল স্টেশন এবং বাজার একসময় অনেক জমজমাট ছিল। বরিশালের ইলিশ মাছ প্রথমে গোয়ালন্দ রেল স্টেশন সংলগ্ন মাছের আড়ৎ পট্রিতে আসত, তারপর এখান থেকে সারা বাংলাদেশে ট্রেনে করে ইলিশ মাছের চালান যেত। সেসব এখন পুরান কথা।

১৫০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় মোট আবাদি জমি রয়েছে মাত্র ১০,২৯৫ হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় প্রতি বছরই কিছু কিছু জমি নদী ভাংগনের শিকার হয়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই উপজেলায় সব ধরনের ফসলই ভালো হয়, তবে মসলা জাতীয় ফসল এই অঞ্চলে খুব ভালো হয়। এই উপজেলায় প্রায় ৪,৭৬০ হেক্টর জমিতে পাট; ২,৯৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান; ২,৩০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান; ২,০২৮ হেক্টর জমিতে পেয়াঁজ; ১,৪৭৫ হেক্টর জমিতে রসুন; ১,৩১০ হেক্টর জমিতে গম; ১২০ হেক্টর জমিতে ভূট্রা, ১,২৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা; ১,০৭৭ হেক্টর জমিতে ডাল জাতীয় ফসল;  ৭৮০ হেক্টর জমিতে বেগুন;  ৩২৫ হেক্টর জমিতে টমেটো; ১৪০ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়া; ৬৫০ হেক্টর জমিতে তিল; ৫৩৯ হেক্টর জমিতে ধনিয়াসহ অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসল এবং ১০ হেক্টর জমিতে বার্লির আবাদ রয়েছে। এছাড়াও এই উপজেলায় কলাসহ অন্যান্য ফল, অন্যান্য সবজি এবং কিছু অপ্রচলিত ফলের আবাদ রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই এই উপজেলা খাদ্যে উদ্বৃত্ত উপজেলা হিসেবে এর সুনাম ধরে রেখেছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরেও প্রায় ৭০০ মে.টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আমরা ধারনা করছি। খাদ্যে উদ্বৃত্ত উপজেলা হলেও এখানে কৃষি কাজে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নদী ভাঙন এবং আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে উপজেলার কৃষি জমিতে পানি ঢুকে যাওয়া। ফলে আমন ধান আবাদ এবং আগাম বেগুন ও টমেটো চাষ প্রায় বিঘ্নিত হচ্ছে। নদী ভাঙন এবং অবাঞ্চিত পানি প্রবেশ যদি ঠেকানো যায় তাহলে এই অঞ্চলে শস্য নিবিড়তা অনেক বেড়ে যাবে এবং কৃষকের আর্থ সামাজিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি হবে।

মেথি, বার্লি এবং কালোজিরা এই অঞ্চলের তিনটি সম্ভাবনাময় ফসল। তিনটি ফসল মিলে প্রায় ৮৫-৯০ হেক্টর জমিতে এই ফসল ৩ টি চাষ হচ্ছে। ঔষধী গুণসম্পন্ন এবং উচ্চমূল্য ফসল হওয়ার কারণে কালোজিরা এবং মেথির চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলেছে। আর অন্য দিকে বাংলাদেশের মধ্যে একক ফসল হিসেবে সম্ভবত শুধুমাত্র গোয়ালন্দ উপজেলাতেই বার্লির সর্বাধিক চাষ হয়, যা প্রায় ১০-১২ হেক্টর। বার্লির ছাতু বর্তমানে শুধুমাত্র এই এলাকাতেই পাওয়া যায় এবং বার্লি ও যব সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ার কারণে এর চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সেই নিরিখে এই এলাকার সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে বার্লি, মেথি এবং কালোজিরা উৎপাদনে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি প্রদর্শনী স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই অর্থকরি ফসল গুলোর উৎপাদন বেড়ে যাবে এবং কৃষকরা লাভবান হবে। বার্লি এবং মেথি চাষকে এই অঞ্চলের জন্য ব্রান্ডিং করার উদ্যোগও গ্রহণ করা যেতে পারে।

ক্ষুধা এবং দারিদ্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি দেখতে চেয়েছিলেন দেশের কৃষি ও কৃষকের সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন এবং স্বনির্ভরতা। বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পুরো দায়িত্ব এখন আমাদের সবার। কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্য বিমোচনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সৃদৃঢ় করাই হোক আমাদের চলমান অঙ্গীকার। সুতরাং আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি কৃষিই হচ্ছে আমাদের এ অঙ্গীকার পুরণের প্রধান বাহন।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এর ২নং অভীষ্ট অনুসারে ক্ষুধার অবসান , খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার সরাসরি কৃষি উন্নয়নের সাথে জড়িত। সেই নিরিখে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে গোয়ালন্দ উপজেলায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

আমারা ইতোমধ্যে-

১) কৃষকপর্যায়ে ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের আওতায় ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

২) আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে উন্নত মাানের ধান, গম ও পাট বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের আওতায় ধান, গম ও পাট বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

৩) পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলাতে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বিপননের  উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

৪) উপজেলা পর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ (৩য় পর্যায়) প্রকল্পের মাধ্যমে গোয়ালন্দ উপজেলার কৃষকদেরকে পর্যায়ক্রমে আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

৫) খামার পর্যায়ে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার কৃষকদেরকে পানি সাশ্রয়ী বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী এবং পানি সাশ্রয়ী সেচযন্ত্র প্রদান করা হচ্ছে।

৬) খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প (২য় পর্যায়) এর আওতায় কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

৭) রাজস্ব অর্থায়নে প্রযুক্তি বিস্তার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ফসলের বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর কৃষকদেরকে প্রদর্শনী এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সুতরাং আগামী দিনে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ অর্জন এবং ২০৪১ সালের উন্নত ও সমৃদ্ধ গোয়ালন্দ বিনির্মানে কৃষিই প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

শিকদার মোঃ মোহায়মেন আক্তার

উপজেলা কৃষি অফিসার, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি।

Comments

comments